বুধবার । ২৭শে মে, ২০২৬ । ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

আবুধাবিতে পবিত্র ঈদুল আজহা : শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদে লক্ষাধিক মুসল্লির মিলনমেলা

ফরহাদ হুসাইন, আরব আমিরাত প্রতিনিধি

সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। বিগত কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মেঘ সরে গিয়ে এক প্রশান্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশে পালিত হয়েছে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব। ঈদের সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে বিভিন্ন মসজিদ ও খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন লাখ লাখ মুসল্লি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় আয়োজনটি ছিল আবুধাবির ঐতিহাসিক শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ।

ভোরের আজান থেকেই মসজিদের চারপাশে জমতে শুরু করেন মুসল্লিরা। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণ ধীরে ধীরে ভরে ওঠে হাজার হাজার মানুষে। রাজ পরিবার, আরব নাগরিক থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রবাসী কর্মীরা একসাথে সারিবদ্ধ হন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। নানা বর্ণ, নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতির মানুষ একই কাতারে দাঁড়িয়ে আদায় করেন ঈদের দুই রাকাত নামাজ- এ দৃশ্য যেন ছিল ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতিচিত্র।

মসজিদের ভেতরের অংশ পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর মুসল্লিরা বাইরের প্রাঙ্গণ, করিডোর এবং সংলগ্ন খোলা জায়গাতেও কাতার বেঁধে নামাজে অংশ নেন। মসজিদ কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই বাড়তি জায়নামাজ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে রাখে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন ছিলেন পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের বিশেষ দল।

ঈদের নামাজ শেষে বিশেষ খুতবা প্রদান করেন মসজিদের ইমাম। তিনি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মনের ভেতরের লোভ, হিংসা ও অহংকারকে কুরবানি দেওয়ার শিক্ষা দেয়। ইসলামের শান্তি ও মানবতার বার্তা বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। খুতবায় বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষার উপরেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

দীর্ঘ কয়েক মাস নানা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর এবারের ঈদ প্রবাসীদের কাছে এনেছে এক বিশেষ আনন্দ। সকাল থেকেই আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান ও অন্যান্য আমিরাতের রাস্তাঘাটে ঈদের পোশাক পরে আনন্দমুখর মানুষের ঢল নামে। মসজিদে নামাজ শেষে পরিচিত-অপরিচিত সকলকে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।

বাংলাদেশি প্রবাসী মাসুম বিল্লাহ জানান, “এবার অনেক দিন পর মন ভরে ঈদ করতে পারলাম। গ্র্যান্ড মসজিদে নামাজ পড়তে পারা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি।”

পাকিস্তানি বাসিন্দা আহমেদ রাজা বলেন, “এখানে এত দেশের মানুষ একসাথে নামাজ পড়েন- এটাই ইসলামের সৌন্দর্য।”

নামাজ শেষে পরিবারগুলো একত্রিত হন বিশেষ ঈদ ভোজের আয়োজনে। বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে রান্না হয় পোলাও, কোরমা, বিরিয়ানিসহ নানা ঐতিহ্যবাহী পদ। অনেকে প্রবাসী বন্ধু ও প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করেন একসাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে। শিশুরা নতুন পোশাকে মেতে ওঠে খেলায়, বড়রা বিনিময় করেন ঈদ উপহার ও শুভকামনা।

শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের ঈদ জামায়াত প্রতিবারের মতো এবারও হয়ে উঠেছিল একটি আন্তর্জাতিক মিলনমেলা। বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশের নাগরিক বসবাস করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ঈদের দিন তাদের সম্মিলিত উপস্থিতি এই দেশকে পরিণত করে এক বৈচিত্র্যময় অথচ ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্বের প্রতীকে।

সব মিলিয়ে এবারের ঈদুল আজহা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদের জীবনে এনেছে নতুন প্রাণের স্পন্দন, মনে জাগিয়ে দিয়েছে স্বজন ও মাতৃভূমির উষ্ণ স্মৃতি। “ঈদ মোবারক” -এই দুটি শব্দ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন, ঈদের আনন্দ সবার, কুরবানির শিক্ষা চিরন্তন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন